সুনামগঞ্জ , রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ , ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বর্তমান সরকার ব্যর্থ হলে দেশের অস্তিত্ব রক্ষা কঠিন হতে পারে : শামসুজ্জামান দুদু রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে দেওয়া কালি মুছে ভাইরাল এক রিকশাচালক সুনামকণ্ঠ সাহিত্য পরিষদের সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত ১০০ শয্যার জনবল-যন্ত্রপাতি দিয়ে চলছে ২৫০ শয্যার সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল বিপন্ন যাদুকাটা, মরাচেলা, ধোপাজান নদী সুনামগঞ্জে দুই দিনব্যাপী মহালয়া উৎসব সম্পন্ন দিরাই প্রেসক্লাবের কমিটি গঠন সড়কপথে পাচার হচ্ছে লুটের বালু, রাতের আঁধারে অর্ধশতাধিক যানবাহনে বালু পরিবহন, ভিডিও ধারণ করায় সাংবাদিককে হেনস্তা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাভি পিল্লাই ৬৪ জেলায় কনস্টেবল নিয়োগ দেবে পুলিশ আজ শুভ মহালয়া আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ সুনামগঞ্জে বাণিজ্য মেলা ঘিরে নতুন প্রত্যাশা প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ গড়ে তোলার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসছে ৩৩ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পথে যেতে যেতে: পথচারী তাহিরপুরে আবারও সংঘর্ষের প্রস্তুতি, লাঠি হাতে পরিস্থিতি শান্ত করলেন এমপি কামরুল ১৮ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে বিদায়ী সম্মাননা প্রদান ‎সাচনা বাজারে আইএফআইসি ব্যাংকের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন
বালু-পাথর লুট

বিপন্ন যাদুকাটা, মরাচেলা, ধোপাজান নদী

  • আপলোড সময় : ১১-১০-২০২৬ ০৯:১৭:২১ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১১-১০-২০২৬ ০৯:২০:২২ পূর্বাহ্ন
বিপন্ন যাদুকাটা, মরাচেলা, ধোপাজান নদী
বিশ্বজিত রায়::
বালু লুটের তা-ব থেকে রেহাই পাচ্ছে না সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, মরাচেলা ও ধোপাজান চলতি নদীর তীরবর্তী বাসিন্দারা। নদীগুলো কার্যত ইজারাবিহীন থাকলেও থেমে নেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন কার্যক্রম। টাস্কফোর্সের অভিযানের মাঝে লুটপাট চলমান থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক দাবি স্থানীয় প্রশাসনের।

পরিবেশ কর্মী ও স্থানীয়দের ভাষ্য, অবৈধ বালু উত্তোলনে পরিবেশ বিপর্যয় ও বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস হচ্ছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দিনরাত কোটি কোটি টাকার বালু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালী চক্র। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় নদীতে এসব হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযানে শ্রমিকদের আটক করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে মূল হোতারা।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্ত দিয়ে যাদুকাটা, দোয়ারাবাজার-ছাতক সীমান্ত দিয়ে চেলা (সোনালী চেলা-মরাচেলা) এবং সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডলুরা সীমান্ত দিয়ে ধোপাজান চলতি নদী দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। আন্তঃসীমান্ত নদী তিনটির উৎপত্তিস্থল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ী এলাকা থেকে। বিভিন্ন নামে সুরমা নদীতে পতিত হওয়া নদীগুলো প্রকৃতি-পরিবেশ, জীবন-জীবিকা, ঐতিহ্যের অংশ হলেও বালু লুটের আগ্রাসী তৎপরতায় সর্বস্ব হারাতে বসেছে নদীতীরের মানুষেরা। গত ৪ অক্টোবর দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা নদীর কাজিরগাঁও এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। ৬ অক্টোবর মরাচেলা নদীর পার কেটে অবৈধভাবে বালু তোলায় ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
মামলার এজাহারে ২৫ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ দিনে মরাচেলা থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকার ২৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এর আগে অবৈধভাবে যাদুকাটা ও ধোপাজান নদীর পার কেটে শত কোটি টাকার বালু উত্তোলনের অভিযোগেও মামলা হয়েছে। মামলার গতি-প্রকৃতি থেমে থাকলেও থেমে নেই বালু লুটের কার্যক্রম।
গত মঙ্গলবার দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তঘেঁষা মরাচেলা নদীর পূর্ব সোনাপুর অংশে গিয়ে দেখা যায়, নদীর বস্তি পার কেটে দেদারসে বালু তোলা হচ্ছে নৌকায়। নিজেদের সীমানায় নদীর পার কাটা ঠেকাতে কয়েকজন বাধা-নিষেধ দিলেও মানছে না বালু লুটকারীরা।
মানুষের সুর-চিৎকার ও শেলো মেশিনের বিকট শব্দে নদীজুড়ে বিরাজ করছে অরাজক পরিবেশ। পাড় কেটে, বুক চিরে নদীর শেষকৃত্য সম্পন্নের আয়োজন জোরেশোরে বাস্তবায়িত হলেও বালু লুট ঠেকাতে প্রশাসনের নজরদারি দেখা যায়নি। এ অবস্থায় নদী রক্ষার আকুতি স্থানীয়দের।
নদীর পাড় কাটা তীরে ছাতা মাথায় হাঁটাহাঁটি করছিলেন পূর্ব সোনাপুর গ্রামের আমির হামজা। বালু উত্তোলন রোধে নদীতীরবর্তী নিজ সীমানা পাহারা দিচ্ছিলেন তিনি। একাধিকবার বালু না তুলতে শ্রমিকদের শাসাতেও দেখা যায় তাকে।
প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করলে আমির হামজা বলেন, ‘এই গ্রামের ছিদ্দিক মিয়া, তার ভাই-ভাতিজারা এইডা নিয়ন্ত্রণ করতাছে। সাথে বাইরের আরও ২০-৩০ জন আছে। বাধা দিলেও মানে না। তারা আমিসহ আমার ভাইরে মারধর কইরা হাসপাতালে পাঠাইছে।’
পাশে দাঁড়ানো একই গ্রামের বালুশ্রমিক আসগর আলী আমির হামজার কথায় সায় দিয়ে বলেন, ছিদ্দিক, হামিদ, কাদির, মুরছালিন, আব্দুর রহমানরা জোর কইরা এরার (আমির হামজাদের) জায়গা খাইতাছে। বাধা দেওয়ায় তারা দুই ভাইরে মারছে। এদের সাথে ছাতক, কোম্পানীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বড় বড় মানুষ আছে। আমরা চাই না, আমরার বাড়িঘর ভাঙ্গুক। আসগর আলী জানিয়েছেন, কয়েকদিন আগে এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছে। প্রতিবাদের মুখে শ্রমিকরা নৌকা নিয়া পালাইছে। পরেরদিন জোর কইরা আবার নদীর পাড় কাটা শুরু করছে। বাধা দেওয়ায় হামলা-মামলা করে তাদেরকে নানাভাবে হয়রানির অভিযোগ করেন আসগর আলী।
এদিকে, ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টে পটপরিবর্তনের পর জেলার বৃহৎ বালুমহাল যাদুকাটা নদীতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল বালু লুটেরা চক্র। তখন সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। পরে ইজারা মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ছয় মাসের জন্য খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জেলা প্রশাসন।
২৯ সেপ্টেম্বর আগের এক ইজারাদারের রিটের প্রেক্ষিতে বালু উত্তোলন তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন আদালত। যে কারণে যাদুকাটা নদী এখন ইজারাবিহীন অবস্থায় আছে। তবে যাদুকাটা তীরবর্তী বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইজারা স্থগিত থাকলেও পার কেটে বালু লুটের উৎসব থামেনি।
একই অবস্থা সুনামগঞ্জ শহরতলির ধোপাজান বালুমহালের। জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৮ সালে ধোপাজান কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের আদেশ দেন আদালত। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালে পাঁচ আগস্টের পর শুরু হয় লুটপাট। সমালোচনার মুখে প্রশাসনের তৎপরতায় বন্ধ হয় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন।
গত বছরের অক্টোবর মাসে সরকারি সিদ্ধান্তে ধোপাজানে আবার বালু উত্তোলন শুরু হলে চলতে থাকে বালু লুটের মহোৎসব। হরিলুট ঠেকাতে প্রশাসন সিসি ক্যামেরায় নজরদারি জোরদার করলেও জেলার একমাত্র বালুমিশ্রিত এই পাথর কোয়ারি থেকে বিভিন্নভাবে বালু লুট হচ্ছে। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, নদীর পাড় কেটে বালু তোলায় ভূপ্রকৃতি পরিবর্তন ও পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হচ্ছে। প্রাণহানিও ঘটছে। লোকদেখানো অভিযানের পরিবর্তে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কাসমির রেজা বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া বালু লুটের মতো অপকর্ম সম্ভব না। যখন যে আসে খোলস পাল্টে তার ছায়ায় চলে যায় স্থানীয় বালুখেকোরা। এদের ব্যবহার করে প্রভাবশালী রাজনীতিকেরা ফায়দা লুটছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে বালু লুট ঠেকানো যাবে না।
মরাচেলায় বালু লুটের বিষয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, এটি ভৌগোলিকভাবে নদীবিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা। আমরা দু’একদিন পর পর অভিযানে যাচ্ছি। স্থানীয় অনেকেই বালু লুটে জড়িত। আশার কথা- স্থানীয়দের মাঝে প্রতিবাদী ভাব চলে এসেছে। নদীতীরের বাসিন্দা এবং টাস্কফোর্সের অভিযান দুইয়ে মিলে পরিস্থিতি এখন ভালো আছে।
ইজারাবিহীন নদীতে বালু চুরির বিষয়টি স্বীকার করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, জেলার ৪টি বালুমহালের মধ্যে যাদুকাটা ও মরাচেলা নিয়ে সমস্যা আছে। বালু লুট ঠেকাতে প্রশাসন নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করছেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
১০০ শয্যার জনবল-যন্ত্রপাতি দিয়ে চলছে ২৫০ শয্যার সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল

১০০ শয্যার জনবল-যন্ত্রপাতি দিয়ে চলছে ২৫০ শয্যার সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল